আবাহন

poem 1.png

1.বেশ অনেক বছর আগের কথা। নবমীর রাত। সবার অনুরোধে দুটি অল্প বয়েসি মেয়ে ধুনুচি নাচ এর ময়দানে নামল। তাদের কথা অনুযায়ী ক্যাসেট চালান হল। মুহূর্তের মধ্যে হেমন্ত মুখার্জী শুরু করলেন ধিতাং ধিতাং বলে। ঠিক ৭ সেকেন্ড সময় লাগলো আমার চারদিকের পৃথিবীটাকে ভুলতে। দুজনের মধ্যে একজন আমার থেকে বয়েসে বছর ৫/৭ এর বড়। সাদা সালওয়ার, ওড়না তা কোমরে বাঁধা। ওড়নার সাথে গোটা জগতটাকে নিজের মধ্যে বেঁধে নিয়েছে। তার হাথে তখন মাটির পাত্র নেই, যেন এপ্রিল মাসের তিরিশটা সূর্য কে নিয়ে সে মণ্ডপ প্রদক্ষিণ করছে। আর আমিও তার সাথে মিশরের পিরামিড, আমাজন এর জঙ্গল, ভেসুভিয়াস এর ভেতর দিয়ে হেটে চলেছি। বয়েস অল্প, সবে সবে ইংরেজি সাহিত্যর প্রেমে পরেছি। ক্লিওপাটরার নাম শুনেছি, সেদিন চোখে দেখলাম। ওদিকে হেমন্ত বাবুও নিজের জীবন দিয়ে গেয়ে চলেছেন। আগামীকাল পূজা শেষ। বোকার মত দাড়িয়ে ভাবছি, জীবনের নবমীর রাত টাও যেন এইভাবেই শেষ হয়।

poem 2

2.কতদিন কিছু লিখিনা। লেখা আসেনা। বাস স্টপ এ দাড়িয়ে থাকি। একের পর এক অন্যের কবিতা চলে যায়ে। যখন কিছু লেখার মত পাই, তখন শব্দের এত ভিড় যে উঠতেই পারিনা। না আছে বসার জায়গা, না ভাল ভাবে ধরে দাঁড়ানর। যাই হোক, আজ দিনের ৬ ঘণ্টা রাস্তাতে কেটেছে। বাড়ি ফিরব প্রায়, দেখলাম একজন বছর ২০/২২ এর মেয়ে, চুল খোলা, পুজোর বাজার সেরে রাস্তা পার হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ ও সিগ্নাল না মেনে সব গাড়ি দাড় করিয়ে দিয়েছে। পৃথিবী একটু আস্তে ঘুরছে, সূর্য টাও যেন একটু ওপরের দিকে উঠল। মেয়েটি রাস্তা পার হয়ে গেল, অষ্টমীর রাত এর ধুনোর গন্ধ পেলাম। প্রতিমা দর্শন ও শেষ।

poem 3

3.দেবী আসে, দেবী যায়। জলে মেশে রঙ, মেশে মাটি। ক্যানভাস জুড়ে ধবধবে খরা কাঁদে শুধু। দেবী আসে, দেবী যায়। কখনও দরজা খোলে যদি, কালো ঘোড়ার মত, তুলির টানে দাপিয়ে চলে ঝোড়ো মেঘের চুল। ওপারে ঘণ্টা বেজে ওঠে। মাতালের মত, বুনো মোষের মত। বোধন না বিসর্জন?

Poem 4.png

  1. টিম টিম চোখে, কাঁপা কাঁপা হাথে, তাল তাল মাটি থেকে, দেবী জেগে ওঠে। আঙুলের আদরে ফোটে চোখ, ঠোঁটে হাসি। এই দেবী মারে না, কাটে না, শুধু স্বস্তির আশ্বাসে বলে, সকল ঝড়ের মাঝে আমি তোমার আশ্রয়। সাধন শোনে আর তার চোখে ভিড় করে আসে কয়েক দশকের শরত এর ঝরা পাতা। মুছে যাওয়া কোনও এক মানবী প্রতিমা, সাধনের দেবী হয়ে ফেরে বারবার। রাত নামে, শীর্ণ ক্লান্ত দেহে, সাধন ঘুমের দেশে ভাসে, বেহুলার মত। পাশের বাড়িতে বেতার বেজে ওঠে। জর্জ দা গাইছেন,

” সব ফুরালে বাকি রহে অদৃশ্য যেই দান,

সেই তো তোমার দান,

মৃত্যু আপন পাত্রে ভরি বহিছে যেই প্রাণ

সেই তো তোমার প্রাণ। ”

-Sayan Aich and Abin Chakraborty; Illustrated by Subarnarekha Pal