এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়?

gfd

হে দুর্লঙ্ঘ ভবিতব্য, এখন তুমিও ঠিক ওইভাবে আমার গলা চেপে ধরে আছো।

মাথা কাটা গেছে, আমি শুধু রক্তটুকু বেরতে দেখার স্বাধীনতা চাইছিপাচ্ছিনা।

                                                “অধীনজয় গোস্বামী

“There will be no loyalty except loyalty towards the party. There will be no love except the love of Big Brother…Always, at every moment; there will be the thrill of victory, the sensation of trampling on an enemy who is helpless. If you want a picture of the future, imagine a boot stamping on a human face forever.”

                                                1984 – George Orwell.

অবাধ্যতা রাষ্ট্রের পতন, অবাধ্যতা সংহতির শত্রুআনুগত্য রাষ্ট্রের রক্ষক, আনুগত্য সৃষ্টি করে নিয়মশৃঙ্খলা।

                         – আন্তিগোনে” – সোফোক্লেস (অনুবাদঃ শিশির কুমার দাস)

 

সপ্নসন্ধানীর “আন্তিগোনে” দেখার পর সর্বপ্রথম যে প্রশ্নটি মনের গভিরে, একেবারে অবচেতনের সাগর থেকে চেতনার বাস্তবতায়ে ভূমিষ্ঠ হয়, তা হল এই থিবেস কোথায়ে অবস্থিত? এ কি গ্রীসের নগরী যার অধিপতি ক্রেয়ন…নাকি এই থিবেস আসলে আমাদের অত্যন্ত পরিচিত এক রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সভ্যতার নিষ্ঠুর উপাখ্যান? রাষ্ট্রের অধিপতি যখন ঠাণ্ডা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে হুকুম দেন “রাষ্ট্র চায়ে আনুগত্য”, তখন প্রশ্ন জাগে যে ক্রেয়নের কণ্ঠস্বর হতে ও কার ধ্বনি ভেসে আসে? মিলে যায়ে ইতিহাস ও সমকাল…সভ্যতার মুখোশগুলো আপনা হতেই খসে পড়ে…কান পাতলেই শোনা যায়ে “ক্রেয়নদের” হুঁসিয়ারী ও সৈন্যদের ভারী বুটের শব্দ… বন্দুকধারীরা বলে ওঠে “সাবধান, রাষ্ট্র কিন্তু নজর রাখছে”।

আন্তিগোনে” দেখব বলে সবে প্রেক্ষাগৃহে পা দিয়েছি, ছুটে এল এক উর্দিধারি নিরাপত্তা-রক্ষী। কালাশনিকভ রাইফেল হাতে বলে ওঠে, অতি পরিচিত হুমকির স্বরে, “নাটক দেখতে এসেছেন না? আমরা কিন্তু সব নজর রাখছি”। প্রেক্ষাগৃহে আসন গ্রহণ করতেই মুখে এসে পড়ে সার্চলাইটের তীব্র দৃষ্টি। প্ল্যাকার্ড হাতে ঘুরে চলে একদল মুখোশধারী। প্রতিটা প্ল্যাকার্ডে বর্ণিত পৃথিবীজুড়ে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত, প্রতিটা মুহূর্তে ঘটে চলা যুদ্ধের দামামা…মিলে যায়ে সিরিয়া ও থিবেস। মঞ্চে স্তূপাকৃতি হয়ে ঝুলতে থাকে মৃতদেহ… মঞ্চ জুড়ে ছড়িয়ে থাকে মৃতদেহ… কাউকে চেনার উপায়ে নেই… দেশ, জাতি, সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে এরা শুধুই মৃতদেহ… অন্তর হতে কে যেন বলে ওঠে, “এত রক্ত কেন?”। গোটা প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে বাজতে থাকে যুদ্ধের খবর, গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা, ব্লগার হত্যার নির্মম সংবাদ, সাংবাদিকদের হত্যা, অপুষ্টি, অনাহার, বাংলাদেশ, সিরিয়া, সোমালিয়া… একে একে সব মিলে যেতে থাকে… এই দমবন্ধকর, সন্ত্রাস-বিধ্বস্ত, মৃতপ্রায় রাষ্ট্রের মাঝে বেজে ওঠে সাইরেন… শুরু হয় কৌশিক সেনের পরিচালনায় “সপ্নসন্ধানীর” নাটক, “আন্তিগোনে”। মনে পড়ে যায় “হ্যামলেট” নাটকে মারসেল্লুসের সেই বিখ্যাত উক্তিঃ

       “Something is rotten in the state of Denmark.”

আন্তিগোনে হল রাজা অয়দিপাউস ও রানি ইয়োকাস্তার মেয়ে। রাজা অয়দিপাউসের মৃত্যুর পর যতদিন তার দুই সন্তান, এতোয়েক্লেস ও পলুনেইকেস, সাবালক হয়নি, থিবেস রাজ্যের রক্ষাকর্তা ছিল অয়দিপাউসের শ্যালক, আন্তিগোনের মামা ক্রেয়ন। দুই ভাই যখন বড় হল, রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে বাধল তুমুল যুদ্ধ। এতোয়ক্লেসের তরবারি বিদ্ধ করে পলুনেইকেসকে। পলুনেইকেসের অস্ত্রে মৃত্যু ঘটে এতোয়ক্লেসের। ক্রেয়ন ঘোষণা করেন যে এতোয়েক্লেস রাষ্ট্রের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছে, তাই তাকে বীরের সন্মানে ভূষিত ও সমাধিস্থ করা হবে। কিন্তু পলুনেইকেস ধ্বংস করতে চেয়েছিল পবিত্র থিবেস নগরি, তাই তার নগ্ন দেহ হবে শকুনের খাদ্য। পলুনেইকেসের মৃত্যু-শোক পালনেও জারি হয় নিষেধাজ্ঞা। আন্তিগোনে এক মুহূর্তে রাজাজ্ঞা ছুড়ে ফেলে দেয়। আন্তিগোনে ঠিক করে যে সে মর্যাদার সহিত পলুনেইকেসের সৎকার করবে। শুরু হয় রাষ্ট্র ও এক নাগরিকের সনাতন যুদ্ধ। ক্রেয়ন মনে করে যোগ্য নাগরিক তাকেই বলে যে সদা রইবে রাষ্ট্রের অনুগত…যে “যুদ্ধের ঝোড়ো দিনেও রইবে আনুগত্যে অবিচল, বিপদের দিনে বিশ্বস্ত সহযোগী”। রাষ্ট্রের কাঠামোর দিকে আঙ্গুল তোলা মাত্রই আন্তিগোনে রাষ্ট্রের চোখে হয়ে ওঠে অপরাধী,  রাষ্ট্রদ্রোহী, বা আজকের দিনে যাকে বলে Anti-National.

রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রর গন্ধ পায়। রাষ্ট্র চায় অবিচল আনুগত্য, নইলে যে রাষ্ট্রের বড় বিপদ। রাষ্ট্রের চোখে সকলেই সন্দেহের ঘেরাটোপে মোড়া। হঠাৎ যদি কেউ গেয়ে ওঠে “কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়…ওরে ভাই রে…”, রাষ্ট্র অমনি গর্জে উঠে বলে, “ এ গান বন্ধ, এর মুখ বেঁধে ফেলো, হাত পা বেঁধে ফেলো, বেঁধে বনের মধ্যে নিয়ে গিয়ে গর্তের মধ্যে ফেলো”। ক্রেয়নও চায় সম্পূর্ণ আনুগত্য। নাটকের মাঝেই ক্রেয়ন বলে ওঠেন, “পিছনের দিকে ওই ব্যাক্তিটি কে? ওই যে দাড়িয়ে আছেন…” ক্রেয়নের মুহূর্তের নির্দেশে বন্দুকধারী সৈন্যরা দর্শক আসনে এক ব্যাক্তিকে ঘিরে ফেলেন। সার্চলাইট দুটি তাদের খুনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দর্শক আসনে। দর্শকদের মধ্যে থেকে ভয়ার্ত কণ্ঠে এক ভদ্রলোক চিৎকার করে ওঠেন, “আমি অনুগত; রাজা, আমি আপনার অনুগত”। নিভে যায় সার্চলাইট… দর্শকরা ক্রমশ নাটকের চরিত্র হয়ে ওঠে…ফিকে হয়ে যায় বাস্তব ও কল্পনার মাঝে সীমারেখাটি, ভেঙ্গে পড়ে মঞ্চ ও দর্শক আসনের মাঝে চতুর্থ দেওয়াল। ক্রেয়নের বিশ্বাস যে মানুষের সত্যিকারের পরিচয় তার রাষ্ট্রের নিয়মের প্রতি আনুগত্যে। যদি কেউ রাষ্ট্রের ওপরে স্থান দেন আত্মীয়তা, সেও রাষ্ট্রের চোখে ঘৃণার যোগ্য। নাটকের শুরুতেই লেখা হয়ে যায় আন্তিগোনেদের ভবিতব্য, যা কালে কালে, যুগে যুগে সত্য। মিশে যায় অতীত ও বর্তমান… অনুরণিত হতে থাকে ক্রেয়নদের নিষ্ঠুর ক্ষমতার আস্ফালন,“রাষ্ট্র তোমাদের বন্ধু, রাষ্ট্র চায় আনুগত্য”।

কৌশিক সেনের নাটকে মঞ্চের ব্যাবহার সর্বদাই সৃষ্টি করে এক কাব্যময়তা। মনে পড়ে যায় “প্রথম পার্থ”, “মুখোমুখি বসিবার”, “কর্কটক্রান্তির দেশ”, “দর্জিপাড়ার মর্জিনারা”…। কিন্তু “আন্তিগোনেতে” এই কাব্যময়তাকে দূরে সরিয়ে মঞ্চ জুড়ে স্থান নেয় এক বর্বর, নৃশংস হত্যালিলা। সৌমিক চ্যাটার্জির এমন বীভৎস মঞ্চ, স্তূপাকৃতি মৃতদেহ, ক্রমাগত হিংসার খবর, গৌতম ঘোষের আবহসঙ্গিত, যুদ্ধের আওয়াজ…সমস্ত কিছু মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক নরক যন্ত্রণা্র। মনে পড়ে যায় আন্তনিও আরতাউদের            “থিয়েটার অফ ক্রুয়েলটি্র”(Theatre of Cruelty) কথা। শুধু দুঃখ এই, যে পরিচালক হয়ত মুখোশধারীদের আরও কিছুটা ব্যাবহার করতে পারতেন। অন্যদিকে, কোরাসদের ভুমিকাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আমার ব্যাক্তিগত মত যে কোরাসদের সংখ্যা কিছুটা কম হলে মঞ্চে অভিনয়ের স্পেসটা আরও প্রসারিত হতে পারত, হয়ত এতটা ভিড় বা “Crowded” লাগত না।

অভিনয়ে ক্রেয়নের চরিত্রে কৌশিক সেন অসামান্য। কৌশিকের ক্রূর দৃষ্টি, আদেশের ভঙ্গিমা, অঙ্গ সঞ্চালন ও হিংস্রতা, এই সব কিছুর বুননে ক্রেয়ন চরিত্রটি মঞ্চে জীবন্ত হয়ে ওঠে। নান্দীকারের “আন্তিগোনের” কথা মাথায় রেখে বলছি, কৌশিকের অভিনয় অনেক দিন মনে থাকবে। “ম্যাকবেথের” কৌশিক সেনের চেয়ে “আন্তিগোনের” কৌশিক সেনকে, অভিনয় ও পরিচালক, দুই ক্ষেত্রেই লেগেছে অনেক পরিণত। “ম্যাকবেথে” পরিচালক তার সমকালীন সমাজকে প্রায় হুবুহু “কোট” করেন, যেখানে ম্যালকম নাটকের শেষে বলে ওঠে, “দশ বছরের কাজ করতে হবে দশ দিনে”। সালটা ২০১২। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়। কিন্তু “আন্তিগোনেতে” কৌশিক নিজেকে ভেঙেছেন ও গড়েছেন। গোটা নাটকে এমন একটিও সংলাপ নেই যা সমকালীন রাজনীতিকে “কোট” করা। অথচ “আন্তিগোনে” হয়ে ওঠে অনেক বেশি সমকালীন। প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত নিষ্ক্রিয় দর্শকরা হয়ে ওঠে নাটকটির সক্রিয় অংশগ্রাহক। কল্পনার জাদুদণ্ডে প্রাণ পায় সমকাল। সমকালের দাবিতে নাটকটি হয়ে ওঠে সমকালীন।

ভালো লাগে হেমনের চরিত্রে শুভ্র সৌরভ দাসের অভিনয়। অন্ধ তেইরেসিয়াসকে(নবনিতা বসু মজুমদার) পৃথিবীর হত্যাযজ্ঞয়ের বর্ণনা দিয়ে চলে এক বালক (ঋদ্ধি সেন)। তবে এ নাটকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বোধয় রেশমি সেনের অভিনীত আন্তিগোনে চরিত্রটি। রেশমি সেনের আন্তিগোনে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় ক্রেয়নের পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে। নান্দীকারের মূল স্ক্রিপ্ট থেকে নেওয়া আন্তিগোনে-ক্রেয়নের দীর্ঘ সংলাপ… রাষ্ট্রের যুক্তি, পাল্টা যুক্তি… শুনতে শুনতে মনে পড়ে যায় বাত্যজনের “রুদ্ধসঙ্গীতের” কথা, যেখানে দেবব্রত বিশ্বাস বলেনঃ

“ক্ষমতা হচ্ছে ক্ষমতাই… সে তোমারে মারবে আবার নানান ভাবে সেই মারকে Justify করবে”।

মনে ধরে থাকে আন্তিগোনের চারিত্রিক দৃঢ়তা। রাষ্ট্রের প্রতি ঘৃণা থেকে আন্তিগোনের জেদ, তার সঙ্কল্প, অভিব্যাক্তি, রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার ভঙ্গিমা এবং সবশেষে তার মৃত ভাইয়ের প্রতি দায়বদ্ধতা…অতি যত্ন সহকারে চরিত্রটিকে মঞ্চে জন্ম দিয়েছে রেশমি সেন। মুগ্ধ হই আন্তিগোনের লড়াই দেখে, তার একক লড়াই। আন্তিগোনেকে তার বোন ইসমেনে বলে, “রাজা্কে মান্য করাই নিরাপদ”। কিন্তু আন্তিগোনে বার বার মনে করিয়ে দেয় সঙ্ঘবদ্ধ রাষ্ট্র-বিরোধী আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা। আন্তিগোনে থাকে তার লক্ষ্যে অবিচল, সে ভেসে চলে ইসমেনের বিপরীতধর্মী স্রোতে। আন্তিগোনে বলেঃ “আমার নির্বুদ্ধিতা নিয়ে আমি একা থাকি, একা। যদি মরি, এ মৃত্যু গৌরবের”।

“কেন আন্তিগোনে?”, কেন? কেন? কেন? বার বার আমি ইতিহাসকে এই প্রশ্ন করি। আনন্দবাজারে প্রকাশিত দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের একটি প্রতিবেদন পড়ে তার কিছুটা উত্তর পাই। “আন্তিগোনে” বাংলার মঞ্চে প্রথম আনে “নান্দীকার”, তারিখটা ২৫ মার্চ, ১৯৭৫। জরুরি অবস্থা। ইন্দিরা গান্ধীর জমানা। চারিদিকে শুধু বারুদের গন্ধ। নান্দীকারের নাটকের বিজ্ঞাপনী স্লোগান ছিলঃ

        “থেবাইয়ের আকাশে শকুন, কলকাতার রাজপথে মৃতদেহও”।

মিলে যায় ইতিহাস ও সমকাল। সালটা ১৯৪৪; হিটলারের রক্তচক্ষু গ্রাস করছে গোটা ইউরোপ। প্যারিসে মুক্তি পেল জ্যঁ আনুইয়ের নবনির্মিত “আন্তিগোনে”। সালটা ১৯৪৮; যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ। ব্রেখট রূপান্তর করলেন সেই “আন্তিগোনে”। কালে কালে, যুগে যুগে, সমকাল প্রশ্ন করে ইতিহাসকে… উত্তর দেয় “আন্তিগোনে”। সিরিয়া থেকে মায়ানমার, কাশ্মীর থেকে উত্তর করিয়া… প্রশ্ন করে সমকাল, উত্তর দেয় “আন্তিগোনে”। প্রেক্ষাগৃহের বাইরে চোখ চলে যায় এক সতর্ক বার্তায়ঃ

        “You are under CCTV surveillance.”

বাড়ি ফেরার পথে অনেকদিন আগে পড়া আন্তিগোনের উদ্দেশ্যে ব্রেখটের লেখা কবিতাটা মনে পড়ে যায়ঃ

Come out of the twilight
And walk before us a while,
Friendly, with the light step
Of one whose mind is fully made up, terrible
To the terrible.

You who turn away, I know
How you feared death, but
Still more you fear
Unworthy life.

And you let the powerful get away
with nothing, and did not reconcile yourself
With the obfuscators, nor did you ever
Forget affront, and let the dust settle
On their misdeeds.
I salute you!

                                 – সাগ্নিক চক্রবর্তী

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s